পৃথিবীর আহ্নিক গতি বলিতে কি বুঝায়? পৃথিবীর যে এই গতি আছে তাহা কিরূপে প্রমাণ করিবে? এইরূপ গতি না থাকিলে কি হইত?
প্রত্যহ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখিয়া আমাদের ইহাই মনে হয় যে পৃথিবী স্থিরই আছে এবং সূর্যই (নক্ষত্রগুলিও) পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরিতেছে। কিন্তু পণ্ডিতগণ মানুষের এই ধারণাকে ভ্রান্ত বলিয়া প্রমাণ করিয়াছেন। পণ্ডিতগণ বলেন সূর্য ও নক্ষত্রগুলি নিশ্চল রহিয়াছে এবং পৃথিবীই তাহার আপন কক্ষপথে ঘুরিতেছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে ইহাই স্থিরীকৃত হইয়াছে যে পৃথিবীর দুইটি গতি আছে,-একটি আবর্তন গতি (Rotation) অপরটি পরিক্রমণ গতি (Revolution)।
আবর্তন বা আহ্নিক গত-
পৃথিবী অনবরত পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে ঘুরিতেছে। পৃথিবী তাহার নিজ মেরুরেখা বা অক্ষের (axis) চারিদিকে ঘুরিতেছে। উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর সংযোগ-রেখাকেই পৃথিবীর অক্ষ ধরা হয়। পৃথিবীর এই আবর্তন-
গতির বেগ ও সময় নির্দিষ্ট। সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করিতে পৃথিবীর সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা। এই সময়কে ধরা হয় সৌরদিন (বা Solar day)। দিনে একবার করিয়া আবর্তন করে বলিয়া এই গতির নাম আহ্নিক গতি (বা Diurnal motion)।
আহ্নিক গতির প্রমাণঃ
(১) ভূপৃষ্ঠের উপর কোন ভারী বস্তুকে যদি অতি উঁচু জায়গা হইতে সোজাসুজিভাবে ফেলা যায় তাহা হইলে ঐ বস্তুাট ঠিক লম্বভাবে না পড়িয়া পূর্বদিকে ঈষং হেলিয়া পড়িবে। পৃথিবী পশ্চিম হইতে পূর্বে ঘুরিতেছে বলিয়াই এইরূপ ঘটিয়া থাকে। বুলো এবং হামবর্গ শহরে এইরূপ পরীক্ষা হইয়াছে।
(২) অন্যান্য গ্রহগুলির দিকে দূরবীনের সাহায্যে তাকাইলে দেখা যায় যে উহারা আপন মেরুরেখায় আবর্তন করিতেছে। পৃথিবী একটি গ্রহ। সুতরাং পৃথিবীরও আবর্তন-গতি থাকা স্বাভাবিক।
(৩) বৈজ্ঞানিক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণের নিয়মানুযায়ী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল বস্তুই পরস্পরকে আকর্ষণ করিয়া থাকে। তবে বড় জিনিসের আকর্ষণই ছোট জিনিসের উপর পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর আকর্ষণে পৃথিবীর সকল জিনিস উহার কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হয়। আবার সূর্য পৃথিবী হইতে অনেক বড়। সুতরাং উহার আকর্ষণের ফলে পৃথিবীই উহার চারিদিকে ঘুরপাক খাইতেছে।
খাইতে থাকে, তবে পৃথিবীর সৃষ্টিতে ইহা ইহার আকার প্রায় (৪) কোন নমনীয় গোল পদার্থ যদি অনবরত পাক ইহার মধ্যভাগ স্ফীত হয় এবং প্রান্তদ্বয় চাপা হইয়া থাকে। অত্যন্ত কোমল ছিল। তখন ক্রমাগত আবর্তনের ফলে আপেলের মত হইয়াছে।
(৫) ফরাসী বৈজ্ঞানিক ফুকো (Foucault) প্যারী শহরের একটি উন্নত মন্দিরের (প্যান্থিয়ন) চূড়া হইতে ৪০০ ফুট লম্বা একটি সরু তারের মাথায় একটি লৌহ-গোলক ঝুলাইয়া ঐ গোলকের সহিত একটি পিন এমনভাবে আটিয়া দেন যে পিনটি নীচের বালুমাত্র স্পর্শ করে। তারপর গোলকটিকে দুলাইয়া দেওয়ার পর দেখা গেল যে উহা একই জায়গায় দাগ না কাটিয়া প্রতি-বারে বিভিন্ন জায়গায় দাগ কাটিতেছে। পরিদোলক বা Pendulum সর্বদা এক সমতলেই দোল খাইয়া থাকে। অর্থাৎ এই ক্ষেতেও দোলনতলের
পরিবর্তন হয় নাই। ইহার দ্বারা তিনি প্রমাণ করিলেন যে ভূপৃষ্ঠ সরিয়া যাওয়ার ফলেই উহা সম্ভব হইয়াছে।
(৬) পৃথিবীর উপর বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বাঁকিয়া যায়। ইহা পৃথিবীর আবর্তনেরই ফল।
